রাখাল বিশ্বাস: নেত্রকোনার কেন্দুয়া বাজারে কুকুরের আতংকে মানুষ আতংকিত। দিনে যেখানে মানুষের ভিড়ে সরব, রাত গভীর হলেই সেখানে কুকুরের জন্য এলাকাটি ভিন্ন এক রূপ নেয়। রাতের গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারের মোড়গুলো চলে যায় কুকুরের দখলে। গার্লস স্কুল মোড় থেকে ভেটেরিনারি অফিস হয়ে কাঁচা বাজারের রাস্তাটি পরিণত হয় এক আতঙ্কজনক এলাকায়। দলবদ্ধ বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব এলাকায় এতই প্রকট যে পথচারীরা প্রায়ই আক্রমনের শিকার হচ্ছেন। কুকুরে কামড়ানোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে।
মাত্র ৭ দিন আগে সাংবাদিক কাউসার তালুকদারসহ ক’জন এই সড়কেই কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে শয্যাগত। তার আগে পাশের উপজেলা নান্দাইলে ফজরের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এক মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের ওপর বেওয়ারিশ কুকুরের মর্মান্তিক হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক মাসে কুকুরের কামড়ের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। গত ২১ মার্চ ২০২৬ তারিখে একদিনেই কেন্দুয়া উপজেলায় বয়স্ক ও শিশুসহ অন্তত ২০ জন মানুষ কুকুরের কামড়ে আহত হয়েছেন। এটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, জননিরাপত্তারও একটি অশনী সংকেত। আক্রান্তদের অনেকেই এখনো শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক দুশ্চিন্তায় ভূগছেন। তাছাড়া রাস্তায় ও দোকানপাটের আশপাশে অনেক সময় রুগ্ন ও ছিলাযুক্ত লোমহীন কুকুর অবস্থান করে। এদিকে হাসপাতালে তো ভ্যাকসিন নেই-ই দোকানেও ভ্যাকসিন সংকট। পাওয়া গেলেও চড়ামূল্যে কিনতে হয়।
কুকুরের বিষয়ে মঙ্গলবার কথা হয় সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মি শাহ আলী তৌফিক রিপনএর সাথে। তিনি বলেন,কুকুর দেখলেই ভয়,আতঙ্ক, অস্থিরতা এসব এখন বাস্তবতা।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- এর সমাধান কি শুধুই হাসপাতালে সূলভ ভ্যাকসিন পাওয়া? নিঃসন্দেহে ভ্যাকসিন সহজলভ্য হওয়া জরুরি। কিন্তু এটিই প্রতিরোধমূলক নয় বরং পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থা। সমস্যার মূল জায়গা বেওয়ারিশ কুকুরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল এবং সেটি রয়ে যাচ্ছে অমীমাংসিত যা এখনই নিয়ন্ত্রন প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন,প্রাণীবিজ্ঞান ও নগর ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় খাদ্য ও আশ্রয়ের প্রাপ্যতা বাড়লে বেওয়ারিশ প্রাণীর সংখ্যাও সেখানে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।
তাই কুকুরগুলোকে দোষারোপ না করে, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র টেকসই সমাধান বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যেমন, বেওয়ারিশ কুকুরকে ধরে বন্ধ্যাকরণ ও রেবিস টিকা দিয়ে আবার নির্দিষ্ট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া। রিলোকেশন (পুনর্বাসন) করা জনবহুল এলাকা থেকে কুকুরগুলোকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্থানান্তর করা।বাজার এলাকায় উন্মুক্ত খাদ্য বর্জ্য কমানো, যা কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে কুকুর দেখলে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়-এসব বিষয় মেনে চলা।এটা হবে পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন ও ভেটেরিনারি বিভাগের যৌথ কার্যক্রম যা স্থানীয় প্রশাসনের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ক্ষেপণ নয়, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হওয়া। যারা প্রতিদিন রাতে বাজার এলাকায় চলাচল করেন, তাদের জন্য এটি শুধু একটি সমস্যা নয় বরং প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে-কেন্দুয়ায় বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে একটি সুস্পষ্ট, কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।এব্যাপারে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাতুল ইসলাম জানান, প্রাণী নিধনে আইনগত একটি বিষয় আছে।তাছাড়া বন্ধাকরণ বিষয়টিও সময় ও প্রক্রিয়াগত ব্যাপার। কুকুরে কামড়ানোর বিষয়টি আমাদের নজরে আছে।
Leave a Reply