ছাটগল্প
গন্তব্যে ফেরা
–রফিকুল ইসলাম আধার
ঢাকা থেকে আসা ট্রেনটি যখন গন্তব্যের জামালপুর স্টেশনে এসে থামল, তখন রাতের শান্ত প্ল্যাটফর্মে চেনা-অচেনা যাত্রীদের সাথে নেমে পড়লেন মিথিলা। যাত্রীদের অধিকাংশই যার যার গন্তব্যের টানে দ্রুত স্টেশন ছাড়ল, কিন্তু মিথিলা পারলেন না। জামালপুর স্টেশনের প্রতিটি ইট, লোহার বেঞ্চ আর সিগন্যালের লাল-সবুজ আলো যেন তাকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে গেল পাঁচ বছর পেছনের এক অচিন অতীতে। পাঁচ বছর আগে এই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই অশ্রুসজল চোখে তিনি বিদায় জানিয়েছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, আমেরিকাগামী আদিত্যকে।
তারপর এক বিষণ্ন শূন্যতা। বিদেশের জটিলতায় আদিত্য মিথিলার নতুন নম্বরটা জোগাড় করতে পারেনি, আর ওদিকে বাবার প্রবল মনস্তাপ ও পারিবারিক ভুলে মিথিলার ফোন নম্বরটাও বদলে যায়। সম্পর্কের সুতোটি এভাবেই হঠাৎ আলগা হয়ে গিয়েছিল।অথচ কী গভীর ছিল সেই দিনগুলো! আদিত্য জামালপুর সদরের ছেলে, আর মিথিলা ইসলামপুরের। আশেক মাহমুদ কলেজের ক্লাসরুম থেকে শুরু হওয়া সেই বন্ধুত্ব কখন যে অনুভূতির গভীরে মূল গেড়েছিল, তারা নিজেরাও টের পায়নি। দুজনেই মেধাবী; এইচএসসি পার হয়ে আদিত্য স্থান পেল ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ে, আর আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যবিত্ত পরিবারের মিথিলা ভর্তি হলেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে।
ভূগোল আর দূরত্বের ব্যবধান বাড়লেও তাদের হৃদয়ের ব্যবধান বাড়েনি। ঢাকা, ময়মনসিংহ কিংবা জন্মজেলা জামালপুরের আনাচে-কানাচে কাটে তাদের কত স্মৃতিময় আড্ডা, স্বপ্ন বোনার প্রহর! স্মৃতির সাগরে ডুব সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ তন্দ্রা ভাঙল মিথিলার। খুব কাছ থেকে ভেসে এল একটি ভীষণ চেনা কণ্ঠস্বর- ‘হ্যাঁ মা, স্টেশনে পৌঁছে গেছি। পনেরো মিনিটের মধ্যেই তো ঢাকার ট্রেন চলে আসবে..’ কণ্ঠটা কানে আসতেই মিথিলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল।
এত বছর পরও এই কণ্ঠ কি ভুল হওয়া সম্ভব? পেছনে ফিরে তাকাতেই থমকে গেলেন মিথিলা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আদিত্য! কাঁচা-পাকা চুল, ফ্রেঞ্চ দাড়ি আর সানগ্লাসে আদিত্যের চেহারায় এসেছে এক ধরনের বয়সের গাম্ভীর্য। আদিত্যও লাগেজ টেনে বিশ্রামাগারের দিকে এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সানগ্লাসটা এক ঝটকায় চোখের ওপর থেকে সরিয়ে অপলক চেয়ে রইল মিথিলার দিকে। সময়ের ঝড় মিথিলার রূপেও এক বিষণ্ন আর বদলে যাওয়া ছায়া ফেলে গেছে। দুজনে মুখোমুখি। প্ল্যাটফর্মের কোলাহল যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। দুজনের বুক চিরে একসাথেই দীর্ঘশ্বাসের মতো উচ্চারিত হলো- ‘মিথিলা?’ ‘আদিত্য?’ কেউ আর কথা বাড়াতে পারল না। চোখের দৃষ্টিতে শত প্রশ্ন, অভিমান আর না-বলা হাজারও যন্ত্রণা।
একটু সামলে নিয়ে আদিত্যই নীরবতা ভাঙল। কণ্ঠে জমে থাকা পাঁচ বছরের জমানো ক্ষোভ ও যন্ত্রণা- ‘স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা যাওয়ার দিন এই স্টেশনে দাঁড়িয়েই তো আমাকে বিদায় জানিয়েছিলে মিথিলা। বিদেশে গিয়ে নতুন নম্বর থেকে তোমার সাথে কত যোগাযোগের চেষ্টা করেছি! শেষমেশ যখন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অন্য মাধ্যমে খবর পেলাম—তোমার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে, তুমি সুখে আছ আর আমি যেন তোমার জীবনে আর কোনো অশান্তি না আনি… সেদিন বুকটা ফেটে গেলেও তোমার সুখের কথা ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম।’ আদিত্যের কথা শুনে মিথিলার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক বিষাদময় কাষ্ঠহাসি। চোখের কোণে জল ছলছল করে উঠল।
তিনি করুণ গলায় বললেন, ‘বিয়ে? আদিত্য, আমি যখন জানতে পারলাম তুমি ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ওপারেই মারা গেছ, আর তোমার দেশের বাড়িতে শ্রাদ্ধও হয়ে গেছে… সেদিনই তো আমি আমার জীবন থেকে বিয়ের নামটা চিরতরে মুছে ফেলেছিলাম। তবে আর কার সাথে আমার বিয়ে হতো বলো?’ আদিত্য যেন আকাশ থেকে পড়ল! ‘কী বলছ এসব? এত বড় আর ভয়ঙ্কর মিথ্যে কথা কে তোমাকে বলল?’ ‘তোমার পিসাতো ছোট বোন কবিতা।’ মিথিলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। আদিত্য এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রুদ্ধশ্বাসে বলল, ‘মিথ্যে! পুরোটাই এক নির্মম সাজানো নাটক! আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি যেন পড়াশোনা শেষ না করে কোনোভাবেই দেশে না ফিরি। আর পরে কবিতার সাথেই আমাকে বেঁধে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম চক্রান্ত ছিল ওটা। কদিন আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় কবিতা মারা যাওয়ার পরই ওই কুৎসিত নাটকের সত্যটা আমার সামনে ফাঁসমুক্ত হয়।’
আদিত্য একটু থেমে মিথিলার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে এল। চোখে গভীর ব্যাকুলতা, ‘কিন্তু আমার পরিবার না হয় ওই নাটক সাজিয়েছিল, তোমার পরিবার তোমার বিয়ের মিথ্যে খবরটা রটাল কেন?’ মিথিলা দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তোমার পরিবারের কাছ থেকে তোমার মৃত্যুর মিথ্যা খবর পেয়ে আমার পরিবার চায়নি আমি আর কোনো জটিলতায় জড়াই। তাই সমাজকে আড়াল করতে ওরা আমার বিয়ের একটা রটনা তৈরি করেছিল। কিন্তু আমি তো জানতাম, আমার হৃদয় আর কারও হতে পারে না। আমি আজ অব্দি তোমার অপেক্ষাতেই পথ চেয়ে বসে আছি আদিত্য। মাস্টার্সটা শেষ করে এখন একটা উন্নয়ন সংস্থায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছি… শুধুই টিকে থাকার তাগিদে।’
আদিত্যের চোখের কোণে জমে থাকা মেঘগুলো নিমেষেই কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল। সে মৃদু হেসে বলল, ‘আমিও সবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছি মিথিলা। আসলে আমার এই এতদূর আসা, অর্জন সবকিছুর পেছনে শুধু একটা মানুষেরই অপেক্ষা লুকিয়ে ছিল। সে মানুষটি তুমি। আজ বোধহয় আমাদের সব বাধা, সব অমানিশা কেটে গেছে। এবার তবে আসল গন্তব্যে চলো?’ সম্বিত ফিরে পেলেন মিথিলা। চোখের জল মুছে সলজ্জ হেসে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি না ঢাকায় যাচ্ছিলে?’ আদিত্য হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, হ্যাঁ, যাচ্ছি তো।
তবে আজ আর নয়! আমার আসল গন্তব্য তো এখানেই রয়ে গেছে।’ রাতের জামালপুর স্টেশনের হলুদ আলোয় দুজন মানুষের মুখে ফুটে উঠল এক অপরূপ প্রশান্তি। ভুল বোঝাবুঝির দীর্ঘ মরুভূমি পেরিয়ে, হারিয়ে যাওয়া হাত দুটি আবার সানন্দে আঁকড়ে ধরল হাত। অবশেষে দুটি পথ এসে মিলল এক চিরন্তন গন্তব্যে। -লেখক : কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক।
মনের ভাবনা,
মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ,
সবার মনের ভাবনা,
কভু এক ধরনের হয়না।
নিজ নিজ কর্মফলে
সমাজের বিচার চলে।
নিজের ধ্যান ধারণা
অন্যের সাথে মিলে না।
তাই বলে কাউকে কভু
হিংসা করা ঠিক হবে না।
দৃষ্টি ভঙ্গি মোর হলে ভালো
সমাজে দেওয়া যায় আলো।
নিজের চোখ থাকলে কালো
অন্যকে দেখা যায় না ভালো।
নিজের মত অন্যকে ভাবলে
ভালো হয় না কোন কালে।
সদায় সঠিক পথে চললে
সমাজের সবাই ভালো বলে।
মনের ভাবনা চলার সাথে
মিলে যায় ভবে এমনিতে।
চলতে হয় ভালো পথে
তখন ভালো লাগে এ জগতে।
মনের ভাবনা, ধ্যান ধারণা
পরিহার করা খুবই কঠিন।
ভালোর সাথে মিশে চললে
মন্দকে মুক্ত করা স্বাধীন।
পৃথিবী
মির্জা ইশতিয়াক আহ্সান মুকুল
এমন একটা পৃথিবী গড়া যায় কি যায় না
যেখানে আছে সুখ আছে হাসি নেই কান্না।
এমন একটা পৃথিবী গড়া কি যায় না
যেখানে আছে প্রেম আছে প্রীতি নেই প্রতারণা।
লতা-পাতা মায়ায় ঘেরা বন্ধনে আত্মীয়
কাছের মানুষ চিরদিন-ই যেথা আপন
হয়ে রয়।
দুঃখ দেখে দুর্দিনে ভুলে ঠিকানা
হয় নাকো কভূ পর কভূ অচেনা।
করে নাকো কারো ক্ষতি পড়ে স্বার্থে
দেয় নাকো কোন আঘাত হৃদয়াঘাতে
সবাই যেখানে বাস করে আবদ্ধ এক মায়াজালে
কেউ কারো চায় না মন্দ সামনে কিবা আড়ালে।
লুকোচুরি খেলা
আলেয়া মান্নান
লুকোচুরি সকল কাজে,
ভালো লাগে দুপুরের রোদের মাঝে।
আবার কখনো আকাশে মেঘ সাজে,
লুকিয়ে থাকি নদীর বাঁকে।
আবার কখনো দরজার ফাঁকে।
ভেজা কাপড় নিই হাতে তুলে,
যে যাই বলুক শুনি দু কানে।
যে হাতে তুলি আবার সে হাতেই দিই ফেলে।
ওমনি করে কাটিয়ে দেই সারাটা দিন খেলে।
লুকোচুরিতে আনন্দে থাকি সকল মেয়ে-ছেলে।
সকাল থেকে রাত বিবর্ণ হয় জল,
লুকোচুরি খেলে পাই মনোবল।
কখনো বড়দের সামনে করতে হয় কৌশল,
এই সেই কথা বলে করি কত ছল।
এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ঘুরে বেড়াই মন খুলে।
ফিরে আসি আবার বিকেল হলে।
আবার কখনো গাছের ডালে।
কেউ এসে কারো কান দিই মলে।
লুকোচুরি করে খেলে-ধুলে,
পিটুনি খাবটাও যাই ভুলে।
রাখালের সাথে গরু চড়াই,
মাঝির সাথে বৈঠাও চালাই।
পাঠশালায় যাবার সময় পাড়ার সবাই,
সকল ছেলে-মেয়ে ছুটে পালাই।
লুকোচুরি করে কথা শোনা,
দিয়ে যেতাম কত টালবাহানা।
মাঝে মাঝে মিস হতো খানা-ফিনা,
বলতাম খাবার নষ্ট করেছে বিড়াল ছানা।
লুকোচুরিতে সবই ছিলো ছলনা।
Leave a Reply