এম এ মান্নান, মধ্যনগর প্রতিনিধিঃ সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার অধিকাংশ কৃষক ফসলহানীর ঘটনায় হয়ে গেছে সর্বহারা। বোরোধান পাকার ১৫ দিন আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে হারালেন সারা বছরের পরিশ্রমের সোনালী ফসল ধান। এরমাঝে ৩০ ভাগ কৃষক শতভাগ ফসল হারিয়ে, হয়ে গেছে এখন সর্বহারা। ৪০ ভাগ কৃষকের ঋণের ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।
৩০ ভাগ কৃষকের প্রতি একর জমিতে লোকসান অন্তত ৩০ হাজার টাকা দাড়িয়েছে । এরমধ্যে মধ্যনগর উপজেলায় ৩ হাজার ২ শত ৫ হেক্টর জমি চাষাবাদ করা হয়েছে। এবছর বাম্পার ফলন হলেও,অবিরাম অতি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানিতে অনেক কাঁচা ধান তলিয়ে গেছে, পাকা আধা পাকা ধান পচনধরে নষ্টও হয়েছে অনেক। এছাড়াও গবাদিপশুর খাদ্য খড়ও সংগ্রহ করতে পারছে না কৃষকেরা। আবার ধান সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত মজুরি খরচ করতে হচ্ছে, তাছাড়াও আবহাওয়া বিপক্ষে থাকায় রোদের দেখাও মিলছে না। সবমিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ (৬০) ভাগ হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এরমধ্যে গত এপ্রিল এর ২০ তারিখ উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তদন্ত রিপোর্টে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়, জলাবদ্ধতা ৩০০ হেক্টর, নিমজ্জিত এবং বিনষ্ট ২০০ হেক্টর।
বর্তমানে একমাস পর ২০ মার্চ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ দাড়িয়েছে নিমজ্জিত এবং বিনাস হয়েছে ৫০০ হেক্টর, জলাবদ্ধতায় ডুবন্ত ১০ হেক্টর। ৫ হেক্টর জমিতে ৩ ফুট পানি, আরও ৫ হেক্টর জমিতে ২ ফুট পানির জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বাকী ৭ হেক্টর ২ শত ৫ হেক্টর জমিতে ১ ফুট আধা ফুট পানি লেগেই আছে। এক কথায় হাওরে পানি ছাড়া কোনো জমি দেখা যায় না। ইতিমধ্যে ফেসবুক সোশাল মিডিয়া এবং সংবাদ কর্মীর লেখুনীর মাধ্যমে দুর্যোগের চিত্র বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বর্তমান চিত্র ভিন্ন পানিবন্দি ধান কর্তন করতে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
এছাড়াও জ্বালানি তেলও চাহিদা মতো মিলছেনা। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে শ্রমিক ছাড়া ধান সংগ্রহ করা অসম্ভব। শ্রমিকের চাহিদা মিটাতে অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও মিলছেনা শ্রমিক। হাওর থেকে ধান আনতে চলছেনা যানবাহন, লাগাতার বৃষ্টি হওয়ার কারণে মাটি নরম হয়ে, রাস্তার বেহাল দশা। তিন গুণ ভাড়া দিয়ে আনতে হয় পচনধরা ধান। না পারছে ধান বাড়িতে আনতে, না পারছে ধান হাওরে ফেলে রাখতে। যেগুলো ধান কর্তনের উপযোগী আছে, সেগুলো ধান সংগ্রহ করতে, শ্রমিকের মজুরী দুইগুণ বেশি, হাওর থেকে ধান আনতে যানবাহনের ভাড়া তিনগুণ বেশি, মাড়াই মেশিন খরচ দুইগুণ বেশি, চাষাবাদে বিভিন্ন উপকরণ খরচ সহ প্রতি একরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান।
বুদ্ধিজীবীদের হাওর নিয়ে গবেষণার মন্তব্যে জানা যায়, প্রাকৃতিক ভৌগোলিক পরিবর্তন হওয়ার কারণে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ঋতু বিপক্ষে চলে গেছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় রাষ্ট্র এবং দুর্যোগ ব্যবস্হাপনা মন্ত্রনালয় সুপরিকল্পিত ভাবে বিশেষ কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি।
যার দরুন হারাতে বসেছে হাওরের প্রাণ, ভৌগোলিক জৈব বৈচিত্র চলে গেছে বিলীনের পথে। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে হাওর এখন বিপর্যয়ের মুখে। সরকারকে কৃষক বাঁচাতে এবং হাওর বাঁচাতে কার্যকারী উদ্যোগ নেওয়া খুবই জরুরি। এমনটাই মনে করছেন হাওরাঞ্চলে সকল শ্রেনীপেশার মানুষ।
হাওর গুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হলে, নদী খননের মাধ্যমে, টিকসই স্থায়ী বেড়ী বাঁধ নির্মাণ করা, খাল ও বিলের ডোবা খনন করা, এবং পানি প্রবেশ এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইসগেট নির্মাণ, প্রতিটি স্লুইসগেটে বদ্যুতিক পাওয়ার পাম্প স্থাপন সহ বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাতে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা। এছাড়াও বেড়ী বাঁধে বৃক্ষ রোপণ করে পরিবেশ তৈরি করা। তাছাড়াও বাঁধের উপরে ভুমিহীন গৃহহীনের বসতি স্থাপন করাও যেতে পারে।
Leave a Reply