
বিশেষ প্রতিনিধিঃ অধিকমাত্রায় ও নিয়মবর্হিভূতভাবে কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ বালাইনাশকের সহজলভ্যতার কারণে মাটি-পানি-বায়ু দূষণ ও মৌমাছি,ব্যাঙ, শামুক,ঝিনুক, কেঁচোসহ মাটির অনুজীবের বিলুপ্ত হচ্ছে। ফলে পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরী হচ্ছে। পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। কৃষক খালি পায়ে, খালি গায়ে, পিপিপি,মাস্ক,গ্লাভস ছাড়াই কীটনাশক ব্যবহার করে। কৃষকরা শ্রমিকের খরচ কমাতে আগাছা নাশকের ব্যবহার বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি হচ্ছে। বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক‘র উদ্যোগে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধ্যানমূলক সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে নেত্রকোনা সদর উপজেলার হলরুমে কৃষিজমি সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি অধ্যক্ষ আনোয়ার হাসানের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক, আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকতা রেহনুমা নওরীন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফা পারভীন রিপা, কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষণদের চেয়ারম্যান নাজমুল হক, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান,সহসমন্বয়কারী শংকর ম্রং, সবুজ সংহতির মির্জা হৃদয়, কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতিনিধি, ডা. সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া, নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা লিটন মিয়া,পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুলাহ আল মতিন, জেলা বিপনন কর্মকর্তা, সাংবাদিক, গবেষক, কৃষক, কীটনাশক ব্যবসায়ী, মাটি গবেষণার প্রতিনিধি,ভূক্তভোগী কৃষক ও বারসিকের প্রতিনিধি। প্রথমেই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন সাংবাদিক গবেষক তানভীন হায়াত খান।
তিনি জানান নেত্রকোনা জেলার পশ্চিম উলুয়াটি,কয়রাটি,কুনিয়া,পূর্ব উলুয়াটি,আটপাড়ার ইকরাটিয়া, গ্রামের ২৩ কৃষকদের সাথে সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয়। কৃষকেরা কান্ডারী ৫ জি, গ্রীনফোম, ইউনিকোয়াট, রাজটক্স ব্যবহার কে নির্দেশ করছে। একতারা ও ভারটিমেক,সমিক্রন, ভিরতাকো বুলেট, কান্ডারী ৫জি, গ্রিনফোম, ইরেজার, ইউনিকোয়াট, রাজটক্স, সোর্ড, বায়োগ্রীন, সুপার গোল্ড, নাইট্রো, সিলেক্ট প্লাস, রাইস, রিফিট, বাসুডিন, কেটু, রাজধান, কমরেড, নির্মূল, বিফার, সাইক্লোবন্ড, সানফুরান, বেল্ট, ফাটাকেষ্ট, ডিসপেল,ফাইটার নামের কীটনাশক ব্যবহার করেছন। কৃষকেরা কোন রোগবালাই বা সমস্যা হওয়ার আগেই অগ্রিম কীটনাশক ব্যবহার করেন প্রায় সবাই বলেছেন। সমস্যা না হলেও কীটনাশক দিতেন। গত এক বছরে ২৩ জন কৃষক ৪৭০ কাটা জমিতে ১৩৭৫০০ টাকার কীটনাশক ব্যবহার করছেন। কৃষকের ধারণা অনুযায়ি কীটনাশক ব্যবহারের পর যেসব রোগের কথা উল্লেখ করেছেন তা হলো: মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, দুর্বলতা, এবং বিভ্রান্তি. উচ্চরক্তচাপ হওয়া,বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ. খাবারের রুচি কমে যাওয়া,শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, স্নায়ু দুর্বলতা ত্বকের রোগ, ঘুম কম হওয়া, ফুসফুসে ক্যান্সার, চর্ম রোগ, কিডনির সমস্যা, চোখের ছানি সমস্যা, বুক ব্যাথা, হার্টের সমস্যা, খাবারে অরুচি। কীটনাশকের ব্যবহারের ফলেই যে, এসব রোগ হয়েছে তা গবেষণার বিষয়। ২৩ জন কৃষক গত এক বছরে চিকিৎসা বাবদ খরচ করেছেন: ১৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। তারা বলেছেন, নিজে শুধু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তা না পরিবারের অন্য সদস্যরাও যেমন নারী, শিশুরাও আক্রান্ত হয়েছে নানা রোগে। কৃষকেরা জানিয়েছেন কীটনাশক ক্রয়ের সময় কোন রশিদ নিতেন না।
কীটনাশক ব্যবহারের সময় কোন পিপিপি,মাস্ক,গ্লাবস ব্যবহার করেন না। এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব মনে হয়েছে। পোশাক পরিধান করা কেউ জানে কেউ জানেনা। কীটনাশকের লেভেলে বিপদ ও সতর্কতামুলক কথা লেখা থাকলেও অনেকেই পড়েন না। ১৬ জন বলেছেন শ্বাসকষ্ট হয়েছে , ২০জন বলেছেন ঘুম কম হয়, ১৯ জন বলেছেন, চোখে ঝাপসা দেখেন,১০ জন বলেছেন, হাইপ্রেসার, ৩ জন ফুসফুস ক্যান্সার, চর্মরোগ বলেছেন ১৮ জন, ২১ জনের বমি বমি ভাব,২২ জন বলছেন চোখে ঝাপসা দেখেন। গ্রামের মানুষ জানান বিলে কীটনাশকের কারণে মাছ কমে গেছে। জমির কীটনাশক শেষ পর্যন্ত বিল,নদী,খালে গিয়ে পড়ে। গ্রামগুলোর বেশিরভাগ মানুষই কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত এবং প্রায় সকলই কীটনাশক ব্যবহার করে আসছেন। এ গ্রামগুলোর কৃষকেরা কিভাবে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় তা ভালোভাবে জানেন না, ফলে অনেকেই নিয়ম না মেনে কোনরকম প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি ছাড়াই কীটনাশক ব্যবহার করেন। ফলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। যে কারণে পোকার আক্রমণ বেড়ে গেছে। প্রায় সময়ই হাঁস কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় মারা যায়। এলাকায় মৌমাছি কমে গেছে। ফসলের মাঠে মৌমাছিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মানুষের ধারণা মৃত পোকামাকড় খেয়ে পাখিও মারা যায়। অনেক সময় মাঠে ময়দানে পাখির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এলাকায় কীটনাশকের দোকান বেড়ে গেছে। কারণ চাহিদা অনুযায়ি কীটনাশক দোকান বাড়ছে। মৌমাছিকে এখন আর এসব জঙ্গলে মৌচাক বানাতে দেখা যায় না, ঝিঁঝি পোকার ডাক এখন কমই শোনা যায়, হারিয়ে গিয়েছে চন্দ্রা, শালিক, দোয়েল, বক, মাছরাঙা, হলদে,ফিঙ্গেপাখিসহ ফসলের উপকারি অনেক পোকা। মরে যাচ্ছে কেঁচো ও ব্যাঙ। কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে পানিতে কীটনাশক মিশে তা খাল, বিল, নদী এমনকি পুকরের পানিতেও মিশে যাচ্ছে, বাতাসে মিশে যাচ্ছে এবং তারই প্রেক্ষিতে এসব গ্রামের মাছ,পাখি, পোকামাকড়,ব্যাঙ,সাপসহ অনুজীব কমে যাচ্ছে।সভায় সকলের মতামতের মাধ্যমে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো উঠে আসে। কৃষকদের সচেতনতার জন্য স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ ও আলোচনা অনুষ্ঠান করা দরকার , নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার, বাজারজাতকরন, সংরক্ষণ ও বিক্রি যাতে না করতে পারে তার জন্য মনিটরিং বাড়াতে হবে , অনুমোদনহীন দোকান বন্ধ করতে হবে , অর্গানিক কৃষিচর্চা বাড়াতে সরকারী বেসরকারী সহযোগিতা বাড়াতে হবে , কীটনাশকের ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ কীটনাশক বিষয়ে কৃষকের কাছে তথ্য ঘাটতি আছে , কৃষককে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ি কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে , কীটনাশক ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা করতে হবে।
Leave a Reply