মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

পূর্বধলায় ইন্টারনেট ব্যবসায় বিটিআরসি’র নীতিমালা লঙ্ঘন

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৮৯ পঠিত

পূর্বধলা প্রতিনিধি: ডিজিটাল বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হলো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা। তবে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় এই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাকে ঘিরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর নীতিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই এবং বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তার ঝুলিয়ে একটি চক্র ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করছে। সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে পূর্বধলার ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমে একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে তিনটি প্রতিষ্ঠান  স্কাইভিউয়ের দাবিদার মেহেদী, তালুকদার কমিউনিকেশনের দাবিদার শান্ত এবং ‘Sara Networking System’-এর আজিজুল।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেই প্রধানত চারটি অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রথমত, তাদের কোনো দাপ্তরিক কার্যালয়ে মূল আইএসপি’র (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) দৃশ্যমান কোনো সাইনবোর্ড নেই। দ্বিতীয়ত, তারা মূল আইএসপি’র ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিল না নিয়ে, নিচ্ছেন নিজেদের ব্যক্তিগত বা বেনামি বিকাশ নম্বরে। তৃতীয়ত, মূল লাইসেন্সধারীর দেয়া ইন্টারনেট প্যাকেজ ও মূল্যের সাথে এদের দেয়া প্যাকেজের কোনো মিল নেই। এবং চতুর্থত, পপ (POP) বা পয়েন্ট অব প্রেজেন্স স্থাপনের ক্ষেত্রে রয়েছে চরম আইনি অস্পষ্টতা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্বধলা উপজেলা সদরের জামতলা এলাকায় একটি হাফ-বিল্ডিং বাসায় চলছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার কাজ। দায়িত্বে থাকা মেহেদী ফোনে দাবি করেন, তিনি ‘SkyView Online Limited’-এর পূর্বধলা শাখা পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, স্কাইভিউয়ের প্যাকেজ অনুযায়ী ৫শত টাকায় ১৫ এমবিপিএস স্পিড দিচ্ছেন। অথচ স্কাইভিউয়ের মূল ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ৫শত টাকায় স্পিড দেওয়ার কথা ৩৫ MbpsG ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে বিল নেওয়া এবং বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদী বলেন, “গ্রাহক যেভাবে কমফোর্ট ফিল করে সেভাবেই বিকাশ বা ব্যাংকে বিল নেওয়া হয়।

আর বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহারের জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই, সারা বাংলাদেশেই নিয়ম এক।” তবে বিষয়টি নিয়ে স্কাইভিউয়ের হেড অফিসে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার মাহমুদ নামে এক কর্মকর্তা জানান, পূর্বধলায় তাদের নিজস্ব কোনো কানেকশন নেই, মেহেদী মূলত তাদের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ নেওয়া একজন ‘রিসেলার’ মাত্র। প্রায় একই চিত্র কুমার খালি এলাকার ‘শান্তর লাইন’-এর ক্ষেত্রে। শান্ত ফোনে নিজেকে ‘তালুকদার কমিউনিকেশন’-এর প্রতিনিধি দাবি করেন। কিন্তু তার দেয়া জোনাল ম্যানেজার সাদমানের নম্বরে ফোন করলে বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য।

সাদমান জানান, তাদের লাইসেন্সের নাম অরেঞ্জ কমিউনিকেশন এবং পপ স্থাপনের কাগজ এখনো সেভাবে জমা দেওয়া হয়নি, পপ স্থাপন হয়েছে মাসখানেকও হয়নি। অথচ শান্ত জানান ভিন্ন কথা। তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি তিন বছর ধরে ব্যবসা করছেন। জোনাল ম্যানেজারের তথ্যের গড়মিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, “চুরি করে লাইন চালাচ্ছি, আপনি কী করতে পারবেন করেন!” অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই ব্যবসায়ীরা বারবার মূল আইএসপি পরিবর্তন করছেন। মেহেদী ২০২১ সালের দিকে লাইন চালাতেন ‘আইসিসি কমিউনিকেশন’-এর নামে, এখন চালাচ্ছেন স্কাইভিউয়ের নামে। এ.এস.টি.টি কমিউনিকেশন ২০২১ সালে চালাতো ‘ক্রিয়েটিভ আইটি’র নামে, এখন বলছে তারা ‘সারা নেটওয়ার্কিং’-এর লাইন চালাচ্ছে। শান্ত আগে চালাতেন ‘রুমেল আইটি’র নামে, এখন বলছেন তালুকদার বা অরেঞ্জ কমিউনিকেশনের কথা।

এখানে একটি বড় আইনি প্রশ্ন সামনে আসে। বিটিআরসির পপ (POP) নির্দেশনার (ঘ) ও (ঙ) ধারা অনুযায়ী, যেকোনো পপ স্থাপনের ১৫ দিনের মধ্যে তা বিটিআরসির ডেটা ইনফরমেশন সিস্টেমে (DIS) আপলোড করতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করছে এবং বারবার মূল আইএসপি পরিবর্তন করছে। প্রশ্ন হলো  প্রতিবার মূল আইএসপি পরিবর্তনের পর তারা কি নতুন করে পপ স্থাপনের অনুমোদন নিয়েছেন? নাকি কোনো তথ্য আপলোড ছাড়াই অবৈধভাবে চলছে তাদের সংযোগ ? পাশাপাশি, আইএসপি গাইডলাইন ২০২৬-এর ৩০.৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রিসেলার নিজস্ব নামে, ব্র্যান্ডে বা অ্যাকাউন্টে বিল নিতে পারবেন না। এমনকি দৃশ্যমান সাইনবোর্ড থাকতে হবে মূল প্রতিষ্ঠানের নামে। কিন্তু বাস্তবে পূর্বধলায় এর কোনোটিরই প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝোলানো তারের জঞ্জাল।

স্কাইভিউয়ের মেহেদীর দাবি, পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহারে কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। অথচ আইএসপি গাইডলাইনের ১৪.১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের খুঁটি ব্যবহারের আগে লিখিত ‘পূর্বানুমতি’ থাকা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানার কারণে যত্রতত্র তারের চাপে শর্টসার্কিট এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। বিটিআরসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, পূর্বধলায় ব্যবসা করা ‘Neef IT’-এর ডিভিশনাল লাইসেন্সটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৮ নভেম্বর ২০২৩ সালে। অন্যদিকে, এ.এস.টি.টি যে ‘সারা নেটওয়ার্কিং’-এর কথা বলছে, নথিপত্র অনুযায়ী তাদের লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদও গত ১ জুলাই ২০২৩ সালে শেষ হয়েছে বলে দেখা যায়। যদি বিটিআরসির ওয়েবসাইটের এই তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তবে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই এরা কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন  তা একটি বড় প্রশ্ন। পপ স্থাপনে এই অস্বচ্ছতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায়।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট প্রটোকল ডিটেইল রেকর্ড (IPDR) সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু পপ যদি বৈধ না হয়, তবে এই বেনামি সংযোগগুলো ব্যবহার করে সাইবার অপরাধ বা গুজব ছড়ানো হলে অপরাধীদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশ্য সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ নেই, তাদের অফিসে গিয়ে মুল লাইসেন্সধারীর সাইনবোর্ড ও দৃশ্যমান বিষয়গুলি নজরে পরেছে।

ডিভিশনাল লাইসেন্সধারী মিলেনিয়াম কম্পিউটার্স অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং ও উপজেলা ক্যাটাগরিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ‘পূর্বধলা আইটি’-এর সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার ইমরান খান জানান, তারা সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অবৈধ চক্রগুলোর কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু সদর এলাকাই নয়, উপজেলার জারিয়া, ধলামূলগাঁও, গোহালাকান্দা এবং হোগলা এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও লাইসেন্স বা অনুমোদনহীন এমন কিছু কার্যক্রম রয়েছে। সার্বিক বিষয়ে বিটিআরসি’র উপ-পরিচালক মোঃ আব্দুস শাহীদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “যথাযথ প্রক্রিয়া ও অনুমোদন ছাড়া গাইডলাইনের বাইরে ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

“বিষয়টি নজরে আনা হলে পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, পুরো বিষয়টি তারা তদন্ত করবেন এবং অনিয়ম পেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মুল লাইসেন্সধারীর দৃশ্যমান সাইনবোর্ড না থাকা, বিলিংয়ে অস্বচ্ছতা, প্যাকেজের গড়মিল, বারবার নাম পরিবর্তন এবং খুঁটিতে তারের জঞ্জাল পূর্বধলার ইন্টারনেট ব্যবস্থায় এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এখন প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত। ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেবেন এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

 

ব্যাকগ্রাউন্ড
বর্ডার
শিরোনাম
ফন্ট: 55px
Version 4.7 | Developed by Shahin
×

📜 প্লাগইন ব্যবহার বিধি

  • 'ফটো কার্ড তৈরি করুন' বাটনে ক্লিক করুন।
  • আপনার পছন্দমতো শিরোনাম ও রঙ পরিবর্তন করুন।
  • জেনারেট হতে ৫-১০ সেকেন্ড সময় দিন।
  • জরুরী প্রয়োজনে: ০১৭১১৭৯৬৮৩৯
শেয়ার করুন:
এ জাতীয় আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

© All rights reserved © 2021 dainikjananetra
কারিগরি সহযোগিতায় Shahin.bd