বাংলা সংস্কৃতির নৈসর্গিক অভিধানে এক অনন্য ও বহুমাত্রিক নাট্য ধারা হিসেবে যাত্রা শিল্প তার স্বাতন্ত্র্যদ্যোতনায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে রয়েছে। এই শিল্প মাধ্যমটি একাধারে মৃন্ময় ও চৈতন্যময় লোকো প্রাণের অন্তর্গত ভাবনা ভঙ্গি, ঐতিহ্য ও মানব জীবনের নাটকীয় অভিঘাতের প্রতিফলন ঘটায়। যাত্রা জনমানুষের চেতনায় রোপিত একটি শিকড়, যার শাখা- প্রশাখা ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার সমাজ- সংস্কৃতি, ধর্ম-রাজনীতি, ইতিহাস ও সাহিত্যবোধে ।
ঐতিহ্যগত ভাবে যাত্রা মূলত ধর্মীয় আবহে রচিত হলেও কালের অনিঃশেষ স্রোতে তা হয়ে ওঠে সমাজ-মনস্তত্ত্বের এক জটিল প্রতিবিম্ব । ধর্মীয় উদ্দীপনা থেকে যাত্রা সূচনা হলেও এর কাঠামো ক্রমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনুষঙ্গে পূর্ণতা লাভ করে।
গৌরচন্দ্রিকা ও রাধা কৃষ্ণ লীলা কিংবা মহাভারত- রামায়ণের আখ্যান ভাগ থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যাত্রা শিল্প বরাবর রূপান্তরিত হয়েছে, নতুন নতুন পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্কে গ্রহণ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রান্ত ভাগেও বিংশ শতকের মধ্যভাগে এসে যাত্রা শিল্পতার পরিপক্কতা অর্জন করে।
এই সময় যাত্রার মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন সংকট, শ্রেনী বৈষম্য, নারীর অধিকার, রাজনৈতিক নিপীড়ন ইত্যাদি বিষয় সৃজনশীল ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হতে থাকে।সে সময়ের অনেক যাত্রা পালা হয়ে ওঠে মানুষের প্রতিবাদের ভাষা, চেতনার অনুবাদ ও অভিজ্ঞান। তবে এই গৌরবময় উত্তরাধিকারের পাশাপাশি যাত্রা শিল্পের বিবর্তনশীল যাত্রাপথে একাধিক সংকট ও বাধা ছড়িয়ে আছে।
সমাজ ও সংস্কৃতির যে জৈবিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে, প্রযুক্তি ও দৃষ্টি ভঙ্গির যে অবিরাম রূপান্তর ঘটেছে তা যাত্রাকে প্রধান ধারার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যাত্রা আজ অস্তিত্ব সংকটে। ফলত, এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্ত্বায় আক্রান্ত হয়ে এই যাত্রা শিল্প আজ দ্যোদুল্যমান। সমকালীন সাংস্কৃতিক পরিসরে যাত্রা শিল্পের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে সংকটাপন্ন ও বিচলিত।
তথাপি সংকটের আবর্তেও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে সম্ভাবনার উজ্জ্বল আভা, এক নবজাগরণের সূক্ষ্মইঙ্গিত । যাত্রা কেবল এক ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা নয়, বরং এটি বাঙালি জাতি সত্তার সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা সমাজের নৈতিক দ্বন্দ্ব, শ্রেণি চেতনা এবং ইতিহাস চর্চাকে মঞ্চে উপস্থাপন করে।
এই শিল্প মাধ্যমটির ক্রমাবনতি জনিত পরিস্থিতি নিছক বিনোদন বিচ্ছিন্নতার ফল নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত সমাজতাত্ত্বিক ও নান্দনিক উপাদান সমূহের পর্যাপ্ত বিশ্লেষণের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক নীতির সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন।
গবেষক: হৃদয় কিশোর সৌরভ
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়।
Leave a Reply